পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ

সবচেয়ে শক্তিশালী মূলধনের ব্যাংক হবে এটি: গভর্নর

একীভূত হতে যাওয়া নতুন ব্যাংকটি হবে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী মূলধনের ব্যাংক। এর পরিশোধিত মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকে গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

একীভূত হতে যাওয়া নতুন ব্যাংকটি হবে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী মূলধনের ব্যাংক। এর পরিশোধিত মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকে গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার বিষয়

জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘গত এক বছর আমরা যে বিষয়টা নিয়ে ধাপে ধাপে কাজ করেছি, সেটার একটা পর্ব অর্থাৎ হস্তক্ষেপ পর্যায় শুরু হয়েছে। এতদিন এ বিষয়টি কাগজে-কলমে ছিল, এখন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রশাসকরা সাময়িকভাবে কিছুদিনের জন্য ব্যাংকগুলো পরিচালনা করবেন। এ সময় তারা ব্যাংকের সম্পদ ও দায় বুঝে নেবেন এবং পরবর্তী সময়ে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পাদন করবেন।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোর কোম্পানি সেক্রেটারিকে এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানান গভর্নর। তিনি বলেন, ‘চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে “‌নন-ভায়েবল” বা অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে এসব ব্যাংক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে। প্রতিটি ব্যাংকেই প্রশাসকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরো চার কর্মকর্তা বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করবেন। প্রাথমিকভাবে প্রশাসকদের কাজ হলো ব্যবসা চলমান রাখা, আইটি সিস্টেমে নজরদারি ও একীভূতকরণ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া, মানবসম্পদ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ নেয়া ও ব্যাংকগুলোর শাখাগুলোকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা।’

সরকার এরই মধ্যে ব্যাংকগুলোর আর্থিক পুনর্গঠন কৌশল নিয়েছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক ব্যবস্থাপনা। ব্যাংকগুলোয় ৭৫ লাখ আমানতকারীর টাকা সুরক্ষিত রাখতে হবে। প্রতিটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে পরিস্থিতি আর অবনতির দিকে না যায়। একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক উভয়েই প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা দিতে পারবে।’

প্রশাসক বসানোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখন কর্মী ছাঁটাইয়ের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানান গভর্নর। এ বিষয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা। প্রাথমিকভাবে কোনো ধরনের কর্মী ছাঁটাই বা লে-অফের পরিকল্পনা নেই। প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে সীমিত পর্যায়ে কর্মীসংখ্যা যৌক্তিক করা হতে পারে। আপাতত ৭৫০টি শাখার বিদ্যমান জনবল দিয়েই নতুন কাঠামো পরিচালিত হবে। যেখানে একই এলাকায় একাধিক শাখা আছে, সেগুলো একীভূত করে দূরবর্তী এলাকায় নেটওয়ার্ক বাড়ানো হবে। একটি কার্যকর ও শক্তিশালী ব্যাংক তৈরি করাই আমাদের উদ্দেশ্য।’

আমানতকারীদের উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘এটি একটি সরকারি ব্যাংক হতে যাচ্ছে। দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ পরিশোধিত মূলধন ছিল ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। একীভূত ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এটিই হবে সবচেয়ে শক্তিশালী মূলধনের ব্যাংক। তাই কারো আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবে। যাদের আমানত ২ লাখ টাকার নিচে, তারা তাদের পুরো টাকা তুলতে পারবেন। প্রাতিষ্ঠানিক ও ২ লাখ টাকার ওপরে আমানতকারীদের টাকা ধাপে ধাপে উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হবে। এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে গেজেট প্রকাশ করা হবে। কেউ অপ্রয়োজনে টাকা তুলে নেবেন না। ব্যাংকগুলো যেদিন পূর্ণাঙ্গভাবে একীভূত হবে, সেদিন থেকেই আমানতকারীদের বাজারভিত্তিক মুনাফা দেয়া হবে।’

একীভূতের তালিকায় থাকা এসব ব্যাংকের বৃহৎ অংশীদাররাই অনেকাংশে ব্যাংকগুলোর দুরবস্থার জন্য দায়ী। তাদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা হবে কিনা, এমন প্রশ্নে গভর্নর বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক চর্চা ও ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ অনুসরণ করছি। আমাদের হিসাবে ১০ টাকা শেয়ারমূল্যের নেট অ্যাসেট ভ্যালু (মোট সম্পদ মূল্য) ঋণাত্মক ৩৫০-৪২০ টাকা। শেয়ারধারীদের কাছ থেকে আমরা তো ঋণাত্মক অর্থ আদায় করতে যাচ্ছি না। প্রকৃতপক্ষে জনস্বার্থে এটাও আদায় করা উচিত ছিল। আমরা এ শেয়ারমূল্যকে শূন্য করে দিয়েছি।’

তবে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের বিষয় সরকার ইতিবাচকভাবে দেখছে বলে জানান গভর্নর। তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাজারে যারা বিনিয়োগ করেছে, তারা তো ঝুঁকি মূল্যায়ন করেই বিনিয়োগ করেছে। এখন শেয়ারের মূল্য যা-ই হোক না কেন, মালিক হিসেবে তাদেরকেই তো দায়িত্ব নেয়া দরকার। ঋণাত্মক মূল্যের শেয়ারধারীদের বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকার কোত্থেকে টাকা দেবে? তবে এখানে কিছু নৈতিকতার বিষয় আছে। আমরা প্রতিটি দায়ই নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করব। ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের আমানত বা বিনিয়োগকারীদের কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে, সে বিষয়ে পরবর্তী সময়ে গেজেট প্রকাশ করা হবে।’

নতুন সরকার এলে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়ার সুযোগ আছে কিনা, এমন প্রশ্নে গভর্নর বলেন, ‘সরকার দেশের ও জনগণের স্বার্থে কাজ করবে। আমরা যে ব্যবস্থাগুলো নিচ্ছি তা দেশ ও জাতির স্বার্থে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে না। ভবিষ্যৎ সরকারও এ ক্ষেত্রে উপকৃত হবে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যই একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছি আমরা। এখানে বড় ধরনের কোনো বিঘ্নতা ঘটবে বলে আমরা মনে করি না। দেশের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনাই আছে যে পরবর্তী সরকার আগের সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ উল্টে দেয়নি। এ সিদ্ধান্তগুলো জাতীয় স্বার্থে নেয়া হচ্ছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়।’

ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগপর্যন্ত ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তিসহ সব ধরনের লেনদেন বর্তমান ব্যাংকের নামেই পরিচালিত হবে। এ তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একীভূতকরণ প্রক্রিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার। এখানে তথ্যপ্রযুক্তি একীভূতকরণ, জনবল পুনর্গঠন ইত্যাদি সমস্যা একদিনে সমাধান হবে না। সাধারণত এ ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগে। তবে আমরা আরো দ্রুত করার চেষ্টা করছি। আমরা পদ্ধতিগত ও ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাব।’

এ পাঁচটি ব্যাংকের বাইরে আরো অনেকগুলো ব্যাংকের দুরবস্থা থাকলেও সেগুলোকে একীভূতকরণের তালিকায় না আনার কারণ হিসেবে গভর্নর বলেন, ‘একীভূত করতে গিয়ে আমরা দুই ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করেছি। শরিয়াহ্‌ভিত্তিক ও প্রচলিত ব্যাংক। এ পাঁচটি ব্যাংক সবচেয়ে দুর্বল ছিল। এক বা দুটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ তুলনামূলক কম থাকলেও তাদেরকে তারল্য সহায়তা দিয়েও সন্তোষজনক অবস্থায় আনা যায়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ছিল পুরো সিস্টেমকে ঝুঁকির হাত থেকে বাঁচানো। আমরা সেটাই করেছি।’

আরও